নিজের মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে না পেরে গড়লেন বিশেষ শিশুদের জন্য আশ্রয়, আজ সেখানে পড়ছে ৮০ শিক্ষার্থী

গ্রাফিক ডিজাইনার

নিজের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়েকে কোনো স্কুলে ভর্তি করাতে না পেরে যে সংগ্রামের শুরু, সেটিই আজ আশার আলো হয়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জীবনে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাসিন্দা শামছুন্নাহার কবির ২০১৪ সালে মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’। বর্তমানে সেখানে ৮০ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন শিশুদের প্রতি সামাজিক অবহেলা এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও বড় একটি বাস্তবতা। অনেক পরিবারই সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সামাজিক সংকোচের মধ্যে জীবনযাপন করে। এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই নিজের মেয়ের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করতে গিয়ে শামছুন্নাহার কবির গড়ে তোলেন একটি প্রতিষ্ঠান, যা এখন বহু পরিবারের ভরসার জায়গা।
প্রতিষ্ঠার শুরুতে ভাড়া বাসায় কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরে কালিয়াকৈর উপজেলার দক্ষিণ কালামপুর এলাকায় ছয় শতাংশ জমির ওপর স্থায়ীভাবে গড়ে তোলা হয় বিদ্যালয়টি। বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষক সেখানে নিয়মিত পাঠদান করছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ছবি আঁকা, কুটিরশিল্প, কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম।
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শামছুন্নাহার কবির বলেন, “আমার মেয়েকে কোনো স্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি। তখন বুঝতে পারি, আমার মতো আরও অনেক অভিভাবক একই কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকেই স্কুল প্রতিষ্ঠার চিন্তা আসে। আমি চাই সমাজে অবহেলিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পাক, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুক।”
তিনি বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শেখানোর পদ্ধতি আলাদা। তাঁদের জন্য মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, থেরাপি উপকরণ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে আরও বেশি শিশুকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি পাঠ্যবই পাচ্ছে। বর্তমানে ৪৫ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা-ভাতা পাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, ঈদ উপহার এবং শীতবস্ত্রসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তাও নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। সরকারি অর্থায়নে বিদ্যালয়ে অফিসকক্ষ, শিক্ষার্থীদের চেয়ার-টেবিল এবং একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।
২০২২ সালে বিদ্যালয়টি সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধন লাভ করে। প্রতিষ্ঠানটির সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে সভাপতি করে ১৩ সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিভাবক আঁখি আক্তার বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে তাঁদের সন্তানরা ঘরবন্দি জীবন কাটাত। সামাজিকভাবে উপেক্ষিত এসব শিশু দিন দিন আরও অসুস্থ ও হতাশ হয়ে পড়ত। এখন তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে, বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে এবং অনেকেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আরেক অভিভাবক হাবিবার বেগম বলেন, “আমার সন্তান জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী। আগে সারা দিন ঘরে থাকত, কারও সঙ্গে মিশত না। এখন স্কুলে এসে অনেক কিছু শিখছে।”






